সূরা কাহফের শেষ দশ আয়াত

অনুবাদ: Bengali Translation - Abu Bakr Zakaria

ٱلَّذِينَ كَانَتۡ أَعۡيُنُهُمۡ فِي غِطَآءٍ عَن ذِكۡرِي وَكَانُواْ لَا يَسۡتَطِيعُونَ سَمۡعًا ١٠١

যাদের চোখ ছিল অন্ধ আমার নিদর্শনের প্রতি এবং যারা শুনতেও ছিল অক্ষম।

তাফসীর

১০১. আমি সেদিন জাহান্নামকে ওই সব কাফিরদের জন্য প্রদর্শন করবো যারা দুনিয়াতে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হবে। কারণ, তাদের চোখে সেদিন পর্দা থাকবে যা সঠিক কিছু দেখতে বাধা দিবে। উপরন্তু তাদের তখন মানার নিয়তে আল্লাহর আয়াতগুলো শুনার ক্ষমতাও থাকবে না।

أَفَحَسِبَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ أَن يَتَّخِذُواْ عِبَادِي مِن دُونِيٓ أَوۡلِيَآءَۚ إِنَّآ أَعۡتَدۡنَا جَهَنَّمَ لِلۡكَٰفِرِينَ نُزُلٗا ١٠٢

যারা কুফরী করেছে তারা কি মনে করেছে যে, তারা আমার পরিবর্তে আমার বান্দাদেরকে ১ অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে ২? আমরা তো কাফেরদের আপ্যায়নের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহান্নাম।

টীকা

বারতম রুকু’

১ عِنَادِي (আমার দাস) বলে এখানে ফিরিশতা, নেককার লোক এবং সেসব নবীগণকে বোঝানো হয়েছে দুনিয়াতে যাদেরকে উপাস্য ও আল্লাহর শরীকরূপে স্থির করা হয়েছে; যেমন, উদ্যায়ের ও ঈসা আলাইহিস সালাম। কিছুসংখ্যক আরব ফিরিশতাদেরও উপাসনা করত। [ফাতহুল কাদীর] তাই আয়াতে الَّذِيْنَ كَفَرُوْٓا বলে কাফেরদের এসব দলকেই বোঝানো হয়েছে। কোনো কোনো মুফাসসির “আমার বান্দা” অর্থ সৃজিত এবং মালিকানাধীন বস্তু গ্ৰহণ করে একে ব্যাপকাকার করে দিয়েছেন। ফলে আগুন, মূর্তি, তারকা, এমনকি গরু ইত্যাদি মিথ্যা উপাস্যও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। [উসাইমীন, তাফসীরুল কুরআনিল করীম]

২ উদ্দেশ্য এই যে, এসব কাফের আমার পরিবর্তে আমার বান্দাদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে; তারা কি মনে করে যে, এ কাজ তাদেরকে উপকৃত করবে এবং এ দ্বারা তাদের কিছুটা কল্যাণ হবে? [ফাতহুল কাদীর] এই জিজ্ঞাসা অস্বীকারবোধক৷ অর্থাৎ এরূপ মনে করা ভ্রান্তি ও মূর্খতা। অন্য আয়াতে আল্লাহ এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কখনই নয়, তারা তো তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে এবং তাদের বিরোধী হয়ে যাবে।” [সূরা মারইয়াম ৮২]

তাফসীর

১০২. আল্লাহর সাথে কুফরিকারীরা কি ধারণা করছে যে, তারা আমাকে বাদ দিয়ে আমার বান্দা তথা ফিরিশতা, রাসূল ও শয়তানদেরকে মা’বূদ বানিয়ে নিবে?! আমি কাফিরদের জন্য জাহান্নামকে অবস্থানের জায়গা হিসেবে প্রস্তুত রেখেছি।

قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِينَ أَعۡمَٰلًا ١٠٣

বলুন, ‘আমরা কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১?’

টীকা

১ এখানে প্রথম দুই আয়াত এমন ব্যক্তি ও দলকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যারা কোনো কোনো বিষয়কে সৎ মনে করে তাতে পরিশ্রম করে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তাদের সে পরিশ্রম বৃথা এবং সে কর্মও নিস্ফল। কুরতুবী বলেন, এ অবস্থা দুটি কারণে সৃষ্টি হয়। (এক) ভ্রান্তবিশ্বাস এবং (দুই) লোক দেখানো মনোবৃত্তি। [কুরতুবী]

তাফসীর

১০৩. হে রাসূল! আপনি বলে দিন: হে মানুষ! আমি কি তোমাদেরকে আমলের দরুন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এমন লোকদের সংবাদ দেবো না?

ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعۡيُهُمۡ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَهُمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّهُمۡ يُحۡسِنُونَ صُنۡعًا ١٠٤

এরাই তারা, ‘পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পণ্ড হয়, যদিও তারা মনে করে যে, তারা সৎকাজই করছে,

তাফসীর

১০৪. যারা কিয়ামতের দিন দেখতে পাবে যে, তাদের দুনিয়ার সকল প্রচেষ্টা নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ তারা মনে করতো যে, তারা খুব সুন্দর চেষ্টাই করছে এবং অচিরেই তারা নিজেদের আমলের ফায়েদা পাবে। তবে বাস্তব ব্যাপারটি এর বিপরীত।

أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِـَٔايَٰتِ رَبِّهِمۡ وَلِقَآئِهِۦ فَحَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فَلَا نُقِيمُ لَهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَزۡنٗا ١٠٥

‘তারাই সেসব লোক, যারা তাদের রবের নিদর্শনাবলী ও তাঁর সাথে তাদের সাক্ষাতের ব্যাপারে কুফরি করেছে। ফলে তাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে; সুতরাং আমরা তাদের জন্য কেয়ামতের দিন কোনো ওজনের ব্যবস্থা রাখব না ১।

টীকা

১ অর্থাৎ তাদের আমল বাহ্যতঃ বিরাট বলে দেখা যাবে, কিন্তু হিসাবের দাঁড়িপাল্লায় তার কোনো ওজন হবে না। কেননা কুফর ও শির্কের কারণে তাদের আমল নিস্ফল ও গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন দীর্ঘদেহী স্থূলকায় ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, আল্লাহর কাছে মাছির ডানার সমপরিমাণও তার ওজন হবে না। অতঃপর তিনি বলেন, যদি এর সমর্থন চাও, তবে কুরআনের এই আয়াত পাঠ কর

فَلاَنُقِيْمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيٰمَةِوَزْنًا

[বুখারী ৪৭২৯, মুসলিম ৪৬৭৮]

তাফসীর

১০৫. তারা মূলতঃ নিজেদের প্রতিপালকের তাওহীদ বুঝায় এমন সকল আয়াত ও তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে। তাই কুফরির দরুন তাদের সকল আমল বাতিল হয়ে গেছে। ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট তাদের কোন সম্মান থাকবে না।

ذَٰلِكَ جَزَآؤُهُمۡ جَهَنَّمُ بِمَا كَفَرُواْ وَٱتَّخَذُوٓاْ ءَايَٰتِي وَرُسُلِي هُزُوًا ١٠٦

‘জাহান্নাম, এটাই তাদের প্রতিফল, যেহেতু তারা কুফরী করেছে এবং আমার নিদর্শনাবলী ও রাসুলগণকে গ্রহণ করেছে বিদ্রুপের বিষয়স্বরূপ।’

তাফসীর

১০৬. তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত সেই প্রতিদান হবে জাহান্নাম। কারণ, তারা আল্লাহর সাথে কুফরি করেছে এবং আমার নাযিলকৃত আয়াত ও রাসূলদেরকে ঠাট্টার বস্তু বানিয়েছে।

إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ كَانَتۡ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ١٠٧

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের আতিথিয়েতার জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস ১।

টীকা

১ فردوس এর অর্থ সবুজে ঘেরা উদ্যান। এটি আরবী শব্দ, না অনারব এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর, তখন জান্নাতুল ফিরদাউসের প্রার্থনা কর। কেননা এটা জান্নাতের সর্বোৎকৃষ্ট স্তর। এর উপরেই আল্লাহর আরশ এবং এখান থেকেই জান্নাতের সব নাহর প্রবাহিত হয়েছে।' [বুখারী ২৭৯০, ৭৪২৩, মুসনাদে আহমাদ ২/৩৩৫]

তাফসীর

১০৭. নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে সম্মানের জায়গা হিসেবে তাদের জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ জান্নাত।

خَٰلِدِينَ فِيهَا لَا يَبۡغُونَ عَنۡهَا حِوَلٗا ١٠٨

সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখান থেকে তারা স্থানান্তরিত হতে চাইবে না ১।

টীকা

১ উদ্দেশ্য এই যে, জান্নাতের এ স্থানটি তাদের জন্য অক্ষয় ও চিরস্থায়ী নেয়ামত। যে জান্নাতে প্রবেশ করেছে, তাকে সেখান থেকে কখনো বের করা হবে না। কিন্তু এখানে একটি আশংকা ছিল এই যে, এক জায়গায় থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে যাওয়া মানুষের একটি স্বভাব। সে স্থান পরিবর্তনের ইচ্ছা করে। যদি জান্নাতের বাইরে কোথাও যাওয়ার অনুমতি না থাকে, তবে জান্নাতও কি খারাপ মনে হতে থাকবে? আলোচ্য আয়াতে এর জবাব দেয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে, জান্নাতের নেয়ামত ও চিত্তাকর্ষক পরিবেশের সামনে দুনিয়াতে দেখা ও ব্যবহার করা বস্তুসমূহ তার কাছে নগণ্য ও তুচ্ছ মনে হবে। জান্নাত থেকে বাইরে যাওয়ার কল্পনাও কোনো সময় মনে জাগবে না। অর্থাৎ তার চেয়ে আরামদায়ক কোনো পরিবেশ কোথাও থাকবে না। ফলে জান্নাতের জীবন তার সাথে বিনিময় করার কোনো ইচ্ছাই তাদের মনে জাগবে না। [দেখুন, ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

তাফসীর

১০৮. তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। সেখান থেকে কখনো তারা সরে যাওয়া কামনা করবে না। কারণ, এর নিকটবর্তী কোন প্রতিদান সেদিন আর থাকবে না।

قُل لَّوۡ كَانَ ٱلۡبَحۡرُ مِدَادٗا لِّكَلِمَٰتِ رَبِّي لَنَفِدَ ٱلۡبَحۡرُ قَبۡلَ أَن تَنفَدَ كَلِمَٰتُ رَبِّي وَلَوۡ جِئۡنَا بِمِثۡلِهِۦ مَدَدٗا ١٠٩

বলুন, ‘আমার রবের কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য সাগর যদি কালি হয়, তবে আমার রবের কথা শেষ হওয়ার আগেই সাগর নিঃশেষ হয়ে যাবে—আমরা এর সাহায্যের জন্য এর মত আরো সাগর আনলেও ১।

টীকা

১ অর্থাৎ যদি সাগরের পানি আল্লাহর কালেমাসমূহ লেখার কালি হয়ে যায়, তবে আল্লাহর কালেমাসমূহ শেষ হওয়ার আগেই সাগরের পানি নিঃশেষ হয়ে যাবে। যদিও এর কালি বাড়ানোর জন্য আরও সাগর এর সাথে যুক্ত করা হয়। [আদওয়াউল বায়ান]] অনুরূপ অন্য স্থানেও আল্লাহ বলেছেন। যেমন, “আর যমীনের সব গাছ যদি কলম হয় এবং সাগর, তার পরে আরো সাত সাগর কালি হিসেবে যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।” [সূরা লুকমান ২৭]

এ আয়াতসমূহ প্রমাণ করছে যে, আল্লাহর কালেমাসমূহ কখনও শেষ হবে না। [আদওয়াউল বায়ান] হাদীসে এ আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ বর্ণিত হয়েছে। তা হচ্ছে, কুরাইশ সর্দাররা ইয়াহুদীদের কাছে এসে বলল, আমাদেরকে এমন কিছু দাও যা আমরা ঐ লোকটাকে প্রশ্ন করতে পারি। তারা বলল, তাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন কর। তারা তাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে নাযিল হল,

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ ۖ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا

অর্থাৎ আর আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন, ‘রূহ আমার রবের আদেশঘটিত এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে অতি সামান্যই।” [সূরা আল-ইসরা ৮৫] এটা শুনে ইয়াহুদীরা বলতে লাগল, আমাদেরকে তো অনেক জ্ঞান দেয়া হয়েছে। আর তা হচ্ছে তাওরাত। আর যাকে তাওরাত দেয়া হয়েছে তাকে অনেক কল্যাণ দেয়া হয়েছে। তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়। [তিরমিযী ৩১৪০]

তাফসীর

১০৯. হে রাসূল! আপনি বলে দিন: আমার প্রতিপালকের বাণীসমূহ সংখ্যায় অনেক। যদি সাগর কালি হয়ে যায় এবং তা দিয়ে এ বাণীগুলো লেখা হয় তাহলে আল্লাহর বাণীগুলো শেষ হওয়ার আগেই সাগরের পানি শেষ হয়ে যাবে। আমি যদি আরো অন্যান্য সাগরের পানি নিয়ে আসি তাহলে তাও শেষ হয়ে যাবে।

قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۠ بَشَرٞ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَيَّ أَنَّمَآ إِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا ١١٠

বলুন, ‘আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র সত্য ইলাহ। কাজেই যে তার রবের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রবের ‘ইবাদাতে কাউকেও শরীক না করে ১।

টীকা

১ এ আয়াতকে দীনের ভিত্তি বলা হয়ে থাকে, এখানে এমন দু'টি শর্ত বৰ্ণনা করা হয়েছে যার উপরই সমস্ত দীন নির্ভর করছে। এক. কার ইবাদত করছে দুই. কিভাবে করছে। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে হবে ইখলাসের সাথে। আবার সে ইবাদত হতে হবে নেক আমলের মাধ্যমে। আর নেক আমল হবে একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথে আমল করলেই। মোদ্দাকথা, শির্ক ও বিদ“আত থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে এ আয়াতে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।

এখানে উল্লেখিত শির্ক শব্দ দ্বারা যাবতীয় শির্কই বোঝানো হয়েছে। তন্মধ্যে কিছু কিছু শির্ক আছে যেগুলো শির্ক হওয়া অত্যন্ত স্পষ্ট তাই তা থেকে বাঁচা খুব সহজ। এর বিপরীতে কিছু কিছু শির্ক আছে যেগুলো খুব সূক্ষ্ম বা গোপন। এ সমস্ত গোপন শির্কের উদাহরণের মধ্যে আছে, সামান্য রিয়া তথা সামান্য লোক দেখানো মনোবৃত্তি। সারমর্ম এই যে, আয়াতে যাবতীয় শির্ক হতে, তবে বিশেষ করে রিয়াকারীর গোপন শির্ক থেকে বারণ করা হয়েছে। আমল আল্লাহর উদ্দেশ্যে হলেও যদি তার সাথে কোনরূপ সুখ্যাতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তির বাসনা থাকে, তবে তাও এক প্রকার গোপন শির্ক। এর ফলে মানুষের আমল বরবাদ এবং ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। মাহমুদ ইবন লবীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি তোমাদের সম্পর্কে যে বিষয়ে সর্বাধিক আশংকা করি, তা হচ্ছে ছোট শির্ক। সাহাবায়ে কেরাম নিবেদন করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! ছোট শির্ক কী? তিনি বললেন, রিয়া। [আহমাদ ৫/৪২৮, ৪২৯] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা যখন বান্দাদের কাজকর্মের প্রতিদান দেবেন, তখন রিয়াকার লোকদেরকে বলবেন: তোমরা তোমাদের কাজের প্রতিদান নেয়ার জন্য তাদের কাছে যাও, যাদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমরা কাজ করেছিলে। এরপর দেখ, তাদের কাছে তোমাদের জন্য কোনো প্রতিদান আছে কি না।’ কেননা আল্লাহ শরীকদের শরীকানার সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। [তিরমিযী ৩১৫৪, ইবনে মাজাহ ৪২০৩, আহমাদ ৪/৪৬৬, বায়হাকী শু'আবুল ঈমান ৬৮১৭]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন যে, আল্লাহ্ তাআলা বলেন, আমি শরীকদের সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উর্ধ্বে। যে ব্যক্তি কোনো সৎকর্ম করে এবং তাতে আমার সাথে অন্যকেও শরীক করে, আমি সেই আমল শরীকের জন্য ছেড়ে দেই। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আমি সেই আমল থেকে মুক্ত; সে আমলকে আমি তার জন্যই করে দেই, যাকে সে আমার সাথে শরীক করেছিল। [মুসলিম ২৯৮৫]

আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি সুখ্যাতি লাভের জন্য সৎকর্ম করে আল্লাহ্ তা'আলাও তার সাথে এমনি ব্যবহার করেন; যার ফলে সে ঘূণিত ও লাঞ্ছিত হয়ে যায়। [আহমাদ ২/১৬২, ১৯৫, ২১২, ২২৩] অন্য হাদীসে এসেছে, “পিপড়ার নিঃশব্দ গতির মতই শির্ক তোমাদের মধ্যে গোপনে অনুপ্রবেশ করে।” তিনি আরো বললেন, আমি তোমাদেরকে একটি উপায় বলে দিচ্ছি যা করলে তোমরা বড় শির্ক ও ছোট শির্ক (অর্থাৎ রিয়া) থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে। তোমরা দৈনিক তিনবার এই দো’আ পাঠ করো

اللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوذُبِكَ أَنْ أُشْرِ كَ بِكَ شَيْىًٔا وَأَنَا أَعْلَمُ وَأَنْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ

[মুসনাদে আবু ইয়ালা ১/৬০, ৬১ নং ৫৪, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/২২৪]

তাফসীর

১১০. হে রাসূল! আপনি বলে দিন: আমি কেবল তোমাদের ন্যায় একজন মানুষ মাত্র। তবে আমার নিকট এ ব্যাপারে ওহী করা হয় যে, তোমাদের সত্য মা’বূদ একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি হলেন আল্লাহ। সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাতের ভয় পায় সে যেন তার প্রতিপালকের প্রতি একান্ত নিষ্ঠা রেখে শরীয়ত মাফিক নেক আমল করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।

পুরো সূরা আল-কাহফ পড়ুন

প্রশ্নোত্তর

সূরা কাহফের শেষ দশ আয়াত কুরআনের কোথায় আছে?

সূরা কাহফের শেষ দশ আয়াত রয়েছে সূরা আল-কাহফ, 18:101-110-এ।