রাতের নামাজের (তাহাজ্জুদ) দোয়া

রাতে নামাজে দাঁড়িয়ে নবীজি ﷺ যে দোয়াগুলো করতেন।

১ একবার

اللهم ربَّنا لك الحمدُ، أنت قَيِّمُ السموات والأرض، ولك الحمدُ أنت ربُّ السموات والأرض ومَن فيهنَّ، ولك الحمدُ أنت نورُ السموات والأرض ومن فيهنَّ، أنت الحقُّ، وقولُك الحقُّ، ووعدُك الحقُّ، ولقاؤك الحقُّ، والجنةُ حقٌّ، والنارُ حقٌّ، والساعةُ حقٌّ، اللهم لك أسلمتُ، وبك آمنتُ، وعليك توكَّلتُ، وإليك خاصمتُ، وبك حاكمتُ، فاغفر لي ما قدَّمتُ وما أخَّرتُ، وأسررتُ وأعلنتُ، وما أنت أعلم به مني، لا إلهَ إلا أنت

অর্থ ও সূত্র

ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তাহাজ্জুদের উদ্দেশে যখন দাঁড়াতেন, তখন দো‘আ পড়তেন, «اللهم ربَّنا لك الحمدُ، أنت قَيِّمُ السموات والأرض، ولك الحمدُ أنت ربُّ السموات والأرض ومَن فيهنَّ، ولك الحمدُ أنت نورُ السموات والأرض ومن فيهنَّ، أنت الحقُّ، وقولُك الحقُّ، ووعدُك الحقُّ، ولقاؤك الحقُّ، والجنةُ حقٌّ، والنارُ حقٌّ، والساعةُ حقٌّ، اللهم لك أسلمتُ، وبك آمنتُ، وعليك توكَّلتُ، وإليك خاصمتُ، وبك حاكمتُ، فاغفر لي ما قدَّمتُ وما أخَّرتُ، وأسررتُ وأعلنتُ، وما أنت أعلم به مني، لا إلهَ إلا أنت». “হে আল্লাহ্! আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, আপনি আসমান যমীন ও এ দু’য়ের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর নিয়ামক এবং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমান যমীন এবং তাদের মাঝে বিদ্যমান সবকিছুর কর্তৃত্ব আপনারই। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমান যমীনের নূর। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আকাশ ও যমীনের মালিক, আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনিই চির সত্য। আপনার ওয়াদা চির সত্য; আপনার সাক্ষাৎ সত্য; আপনার বাণী সত্য; জান্নাত সত্য; জাহান্নাম সত্য; নাবীগণ সত্য; মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য, কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ্! আপনার নিকটই আমি আত্মসমর্পণ করলাম; আপনার প্রতি ঈমান আনলাম; আপনার উপরেই তাওয়াক্কুল করলাম, আপনার সাহায্যেই তর্কে লিপ্ত হলাম এবং আপনাকেই বিচারক মেনে নিলাম। তাই আপনি আমার পূর্বাপর ও প্রকাশ্য গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করুন। এবং আপনি আমার সম্পর্কে যা জানেন, (সব ক্ষমা করুন)। আপনি ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ্ নেই।

মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)। মান: সহীহ

ব্যাখ্যা

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তাহাজ্জুদের উদ্দেশে যখন দাঁড়াতেন, তখন তাকবীরে তাহরীমার পর বলতেন, «اللهم ربَّنا لك الحمدُ» “হে আল্লাহ! আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা।” অর্থাৎ, সমস্ত প্রশংসার পাওনা ও অধিকারী কেবল আপনি। তিনি তার সিফাতসমূহ, নামসমূহ ও নি‘আমাতসমূহের জন্যে প্রশংসিত এবং আরো প্রশংসিত তার ক্ষমতা, সৃষ্টি, কর্ম, নির্দেশ ও বিধানের জন্যে। তিনি প্রশংসিত শুরুতে ও শেষে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে। তারপর বলেন, «أنت قَيِّمُ السموات والأرض» “আপনি আসমান যমীন ও এ দু’য়ের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর নিয়ামক।” অর্থাৎ আপনিই অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন। আপনিই এ দুটিকে ঠিক রাখা ও কায়েম রাখার নিয়ামক। আপনিই স্রষ্টা, রিযিকদাতা, অধিপতি, পরিচালক, জীবন-দাতা ও মৃত্যু-দাতা। তারপর তিনি বলেন, «ولك الحمدُ أنت رب السموات والأرض ومن فيهنَّ» “এবং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমান, যমীন এবং তাদের মাঝে বিদ্যমান সবকিছুর কর্তৃত্ব আপনারই।” আপনি দুইয়ের এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুর মালিক। আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী এ দুইয়ের কর্তৃত্বকারী আপনি নিজেই। আপনি এ দুটিকে অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দানকারী। সুতরাং, মালিকানা আপনার, আপনার সাথে আর কারো কোনো শরীক বা পরিচালক নেই। আপনি বরকতময় ও মহৎ। তারপর তিনি বলেন, «ولك الحمدُ أنت نورُ السماوات والأرض ومن فيهنَّ» “আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমানসমূহ ও যমীনের এবং তদুভয়ে যা কিছু আছে তার নূর।” আল্লাহর একটি সিফাত হলো তিনি নূর, তিনি নূরের দ্বারা মাখলুকের থেকে আড়াল হয়ে আছেন। তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে আলোকিতকারী। আসমানসমূহ ও যমীনের অধিবাসীদের পথ পদর্শক। নূরের সিফাতটি আল্লাহর থেকে অস্বীকার করা যাবে না এবং তাতে কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না। তারপর তিনি বলেন, «أنت الحقُّ» “আপনিই চির সত্য।” হক তার নাম ও সিফাতসমূহ থেকে একটি নাম ও সিফাত। তিনি তার সত্বা ও গুনে সত্য। তার অস্তিত্ব ওয়াজিব। সিফাত ও প্রশংসায় তিনি পরিপূর্ণ। তার অস্তিত্ব তার জাতের অপরিহার্য এক বিষয়। তিনি ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। তারপর তিনি বলেন, «وقولُك الحقُّ» “আপনার বাণী সত্য।” আপনি যা বলেছেন, তা সত্য, হক ও ইনসাফ-পূর্ণ। বাতিল তার সামনে ও পিছনে আসতে পারে না। না পারে তার সংবাদে, হুকুমে এবং শরী‘আতে আসতে এবং না পারে তার প্রতিশ্রুতি ও হুমকিতে আসতে। তারপর তিনি বলেন, «ووعدُك الحقُّ» “আপনার ওয়াদা চির সত্য।” অর্থাৎ আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আপনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। তাতে কোনো পিছপা বা অমিল থাকবে না। তারপর তিনি বলেন, «ولقاؤك حقُّ» “আপনার সাক্ষাৎ সত্য।” অর্থাৎ বান্দাগণ অবশ্যই আপনার সাক্ষাৎ করবেন। তখন আপনি তাদের আমল অনুযায়ী বিনিময় দান করবেন। আল্লাহর দেখা তার সাক্ষাতের অন্তর্ভুক্ত। তাপর তিনি বলেন, «والجنةُ حقٌّ، والنارُ حقٌّ» “জান্নাত সত্য; জাহান্নাম সত্য।” অর্থাৎ উভয়টি প্রমাণিত ও মওজুদ। যেমন, এ বিষয়ে সংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, এ দুটি তাদের অধিবাসীদের জন্য প্রস্তুতকৃত। এ দু’টি হলো স্থায়ী ঘর। বান্দারা ফিরবে এ দু’টি দিকেই। তারপর তিনি বলেন, «والساعةُ حقٌّ» “কিয়ামত সত্য।” অর্থাৎ, কিয়ামতের আগমন সত্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। আর তা হলো দুনিয়ার ইতি ও আখিরাতের শুরু। তার বাণী: «اللهم لك أسلمتُ» “ইয়া আল্লাহ! আপনার নিকটই আমি আত্মসমর্পণ করলাম।” আপনার বিধান অনুগত হলাম, মেনে নিলাম এবং সন্তুষ্ট হলাম। তার বাণী: «وبك آمنت» “আপনার প্রতি ঈমান আনলাম।” অর্থাৎ আপনাকে এবং যা নাযিল করেছেন তা বিশ্বাস করলাম এবং তদুনুযায়ী আমল করলাম। «وعليك توكلت» “আপনার উপরেই তাওয়াককুল করলাম।” অর্থাৎ, আপনার ওপর ভরসা করলাম এবং আমার যাবতীয় বিষয় আপনার প্রতি সোপর্দ করলাম। «وإليك خاصمت» “আপনার সাহায্যে তর্কে লিপ্ত হলাম।” অর্থাৎ আপনি যে সব অকাট্য প্রমাণাদি আমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা হঠকারীদের প্রমাণ তুলে ধরলাম এবং বিজয় লাভ করলাম। «وبك حاكمت» “আপনাকেই বিচারক মেনে নিলাম।” অর্থাৎ যতজন সত্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং মেনে নেয় না তাকে আপনার নিকট বিচারের জন্য নিয়ে আসলাম। সকল তাগুত বা গণক ইত্যাদির বানানো বাতিল বিধান যার দিকে মানুষ বিচার নিয়ে যায় তাকে দূরে ফেলে আমার ও তার মাঝে আপনাকে বিচারক বানালাম। তার বাণী: «فاغفر لي ما قدَّمتُ وما أخَّرتُ، وأسررتُ وأعلنتُ، وما أنت أعلم به مني» “তাই আপনি আমার পূর্বাপর ও প্রকাশ্য গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনিই অগ্র পশ্চাতের মালিক।” অর্থাৎ যেসব গুনাহ সম্পর্কে আমি জানি এবং যা আমি ভবিষ্যতে করব, এবং যা তোমার কোনো মাখলুকের কাছে প্রকাশ পেয়েছে এবং যা তাদের থেকে গোপন রয়েছে, এবং তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তারপর তিনি এ বলে দো‘আ শেষ করেন, «لا إلهَ إلا أنت» “আপনি ব্যতীত সত্য প্রকৃত কোন ইলাহ নেই।” সুতরাং আপনি ছাড়া আর কারো দিকে আমরা ঝুঁকবো না, আপনি ছাড়া আর যাকে তারা ইলাহ বানিয়েছে সবই বাতিল। তার দিকে আহ্বান গোমরাহি ও বিপদ। আর এটিই হলো তাওহীদ যা নিয়ে আল্লাহর রাসূলগণের আগমন এবং যা আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর ওয়াজিব করেছেন।

HadeethEnc.com-এ পড়ুন

২ একবার

اللهمَّ ربَّ جِبرائيل، ومِيكائيل، وإسرافيل، فاطرَ السماوات والأرض، عالمَ الغيب والشهادة، أنت تحكم بين عبادك فيما كانوا فيه يختلفون، اهدني لما اختُلِف فيه من الحق بإذنك، إنَّك تهدي مَن تشاء إلى صراطٍ مستقيمٍ

অর্থ ও সূত্র

আবু সালমাহ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আওফ, তিনি বলেন, আমি উম্মুল মু‘মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে জিজ্ঞাসা করলাম রাতে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে দাঁড়াতেন কি দিয়ে সালাত শুরু করতেন। তিনি বলেন, তিনি যখন রাতে সালাতে দাঁড়াতেন এ বলে শুরু করতেন “হে আল্লাহ! জিবরীল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের রব, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, গায়েব ও প্রকাশ্য সবকিছু জান্তা, আপনার বান্দাগণ যেসব বিষয়ে মতভেদে লিপ্ত আপনিই তার মীমাংসা করে দিবেন। যেসব বিষয়ে মতভেদ হয়েছে তন্মধ্যে আপনি আপনার অনুমতিক্রমে আমাকে যা সত্য সেদিকে পরিচালিত করুন। নিশ্চয় আপনি যাকে ইচ্ছা সরল পথ প্রদর্শন করেন।”

এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মান: সহীহ

ব্যাখ্যা

আবূ সালমা ইবন আব্দুর রহমান ইবন আউফ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম যখন রাতে সালাত আদায় করতেন তখন তিনি কোন দো‘আ দিয়ে সালাত আরম্ভ করতেন সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাতে সালাত আদায় করতেন তখন তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ! জিবরীল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের রব, অন্যান্য ফিরিশতাদের বাদ দিয়ে এ তিনজন ফিরিশতার নাম উল্লেখ করার কারণ, অন্যদের ওপর এ তিনজনের মর্যাদা ও সম্মান বেশি। আর প্রথমে জিবরীল আলাইহিস সালামের নাম উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি আসমানী কিতাবসমূহের রক্ষণাবেক্ষণকারী। ফলে দীনের যাবতীয় বিষয় তার ওপরই ন্যস্ত। আর ইসরাফীল আলাইহিস সালামকে শেষে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি সিঙ্গায় ফু দানকারী। এর মাধ্যমেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। আর মীকাঈল আলাইহিস সালামকে মাঝখানে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি বৃষ্টি ও ফসলাদির নিয়ন্ত্রক। যার সম্পর্ক হলো দুনিয়ার রিযিকের সাথে। তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা অর্থাৎ আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক। গায়েব ও প্রকাশ্য সবকিছু জান্তা। বান্দার থেকে যা দৃশ্য বা অদৃশ্য, সবই তিনি জানেন। আপনার বান্দাগণ দুনিয়ার জীবনে ধর্মীয় যেসব বিষয়ে মতভেদে লিপ্ত আপনিই তার মীমাংসা করে দিবেন। মানুষ দুনিয়া ও ধর্মীয় যেসব বিষয়ে মত বিরোধ করছে সে ক্ষেত্রে আপনারই অনুগ্রহে ও সহজীকরণে আমাকে সত্যের দিশা দান করুন। আপনি যাকে চান সত্য ও সঠিক পথের দিকে পথ দেখান।

HadeethEnc.com-এ পড়ুন

৩ একবার

اللهم اجعل في قلبي نورا، وفي بَصري نورا، وفي سمعي نورا، وعن يميني نورا، وعن يساري نورا، وفَوْقِي نورا، وتحتي نورا، وأمامي نورا، وخلفي نورا، واجعل لي نورا

অর্থ ও সূত্র

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মাইমুনাহর নিকট রাত যাপন করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাহ ওঠে প্রয়োজন পূরণ করলেন, তাপর দুইহাত ও চেহারা ধুইলেন। তারপর ঘুমালেন অতঃপর ঘুম থেকে উঠলেন। তার জন্য পানির পাত্রটি আনা হলো তিনি পাত্রের মুখ খুললেন। অতঃপর তিনি দুইটি ওযূর মাঝে মধ্যপন্থী ওযূ করলেন, যাতে বাড়ালেন না অথচ পরিপূর্ণ ওযূ করলেন। তিনি সালাত আদায় করলেন। আমি তাকে পর্যবেক্ষণ করছি দেখে ফেলবেন অপছন্দ করে গোপনীয়তা অবলম্বন করে উঠলাম। আমি ওযূ করলাম। তিনি সালাতে দাড়ালে আমিও তার বাম পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমার কান ধরে আমাকে তার ডান পাশে ঘুরিয়ে দিলেন। তারপর তের রাকা‘আত সালাত পূর্ণ করলেন। তারপর তিনি কাত হয়ে নাক ডেকে ঘুমালেন। তার অভ্যাস ছিল যখন ঘুমাতেন নাক ডাকতেন। তারপর বিলাল সালাতের ঘোষণা দিলে তিনি সালাত আদায় করেন তবে ওযূ করলেন না। তিনি দো‘আয় বলতেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে নূর (বা আলো) দান করুন, আমার চোখে নূর দান করুন, আমার শ্রবণশক্তিতে নূর দান করুন, আমার ডানে নূর দান করুন, আমার বামে নূর দান করুন, আমার উপরে নূর দান করুন, আমার নিচে নূর দান করুন, আমার সামনে নূর দান করুন, আমার পেছনে নূর দান করুন, আমার জন্য নূর দান করুন”।

মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)। মান: সহীহ

ব্যাখ্যা

এ হাদীসটিতে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সংবাদ দেন, তিনি তার খালা ও রাসূলের স্ত্রী মাইমুনাহর নিকট রাত যাপন করেন। “তিনি তার প্রয়োজন পূরণ করলেন”। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়খানা পেশাবের প্রয়োজন সারলেন। “তাপর দুইহাত ও চেহারা ধুইলেন। তারপর ঘুমালেন”। প্রয়োজন পুরণ করার পর সে তার চেহারা দুইলেন উদ্যোমী হওয়ার জন্য এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য হাত ধুইলেন। “তারপর ঘুম থেকে উঠে পানির পাত্রের নিকট আসলেন ও তার মুখ খুললেন”। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে ওঠার পর পাত্রের নিকট গেলেন এবং পাত্রের ভিতরের পানি বা অন্য কিছু সংরক্ষণের জন্য সে রশি দিয়ে মুখ বাঁধা হয় তা খুললেন। “অতঃপর ওযূ করলেন” সালাতের ওযূর মতো। “দুইটি ওযূর মাঝে মধ্যপন্থী ওযূ করলেন” তাতে কোন কমতি ও বাড়াবাড়ি ছিল না” তা ছিল মাঝামাঝি। এ কারণেই তিনি বলেন, বেশি করলেন না অর্থাৎ তিনবারের কমের মধ্যে সারলেন। এটি জায়েয আছে তবে সুন্নাত হলো তিনবার। “অথচ তিনি পরিপূর্ণ ওযূ করলেন”। অর্থাৎ যেখানে পানি পৌঁছানো ওয়াজিব সেখানে পানি পৌঁছালেন। এতটুকু স্থানে পানি পৌঁছানো ওয়াজিব। “তিনি সালাত আদায় করলেন” অর্থাৎ রাতের সালাত। “আমি দাঁড়ালাম ও গোপনীয়তা অবলম্বন করলাম” ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইিহ ওয়াসাল্লামের কর্মগুলো পর্যবেক্ষণ করতে ছিলেন, তবে তিনি তা ছাপিয়ে গেলেন ও তার বিপরীত প্রকাশ করলেন যেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বুঝেন যে সে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। এ জন্যে তিনি বলেছেন: “আমি তাকে পর্যবেক্ষণ করছি সেটা অপছন্দ করে” অর্থাৎ আমি তাকে দেখছি ও তার কর্মগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। এ কারণে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ছাপিয়ে গেছেন এবং দেখে না-দেখার ভান করেছেন। কারণ মানুষ নিজের ঘরে একাকি হলে এমন কিছু কাজ করে যা কেউ দেখুক সেটা সে চায় না, অথবা তার পর্যবেক্ষণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেনে ফেললে হয়তো তিনি কিছু আমল ছেড়েও দিতে পারেন, কারণ তার অভ্যাস ছিল উম্মতের ওপর ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি কতক আমল ছেড়ে দিতেন। ইবন আব্বাস তার কর্মগুলো গোপন রাখতে চাইলেন যেন সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুম থেকে ওঠা হতে সালাতের জন্যে আহ্বানকারীর আসা পর্যন্ত সকল আমল খুটিয়ে খুৃটিয়ে দেখতে পারেন। এটা তার সরাসরি ইলম অর্জন করার প্রবল আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন “আমি ওযূ করলাম” অপর বর্ণনায় বর্ণিত: “আমি ওযূ করলাম তিনি যেভাবে ওযূ করলেন”। সহীহ বুখারীর অপর বর্ণনায় বর্ণিত: “আমি উঠে দাড়ালা এবং তিনি যা করলেন আমিও তা করলাম”। “তিনি সালাতে দাড়ালে আমিও তার বাম পাশে দাঁড়ালাম”। অর্থাৎ ইবন আব্বাস যখন দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে প্রবেশ করলেন তখন তিনি নিজেও ওযূ করলেন এবং রাসূলের সাথে সম্পৃক্ত হলেন। তবে তিনি তার বাম পাশে দাড়ালেন। “তাই তিনি আমার কান ধরেন” অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কান ধরলেন এবং তাকে বাম দিক থেকে ঘুরিয়ে তার ডান পাশে নিয়ে গেলেন। অপর বর্ণনায় বর্ণিত: “তার ডান হাত আমার মাথার ওপর রাখলেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা আমার ডান কান ধরলেন এবং মলতে লাগলেন”। প্রথমে হাত রাখলেন যাতে কান ধরতে পারেন অথবা হাত প্রথমে মাথাই পড়ছিল অথবা যাতে হাতের বরকত তার ওপর অবতীর্ণ হয় যার দ্বারা সে এ মজলিশ ও অন্যান্য মজলিশের সব আমল সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়। সে বলল, “এবং তা মোছড়ালেন”। হয় সুন্নাতের খেলাফ করার কারণে সর্তক করতে, অথবা এ সব কর্মসমূহ সংরক্ষণে তার সতর্কতা বৃদ্ধি করার জন্য, বা তার তন্দ্রাচ্ছন্নতা দূর করার জন্য, অথবা বাম থেকে ডানে ঘুরানোর জন্য, অথবা বিষয়টি রাতের অন্ধকারে হওয়াতে তার নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য যেমন সহীহ বুখারির বর্ণনায় বিষয়টি ইবন আব্বাস নিজেই স্পষ্ট করেন, অথবা তাকে জাগানোর জন্য বা তার প্রতি মহব্বত প্রকাশ করার জন্য। কারণ, কম বয়স হওয়ার কারণে তার অবস্থা এরই দাবিদার। “তারপর তিনি আমাকে তার ডান দিকে ঘুরিয়ে দিলেন”। অর্থাৎ তাকে বাম দিক থেকে ঘুরিয়ে তার ডান পাশে নিয়ে গেলেন। মুক্তাদী একজন হলে এটিই তার দাড়ানোর স্থান। “তার সালাত পূর্ণ হল”। এ কথার ব্যাখ্যা তিনি করেন। “তের রাকা‘আত সালাত পূর্ণ করলেন”। অর্থাৎ এ রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতিরসহ তের রাকা‘আত সালাত আদায় করেন। প্রতি দুই রাকা‘আতের পর সালাম দ্বারা ব্যবধান করেন। যেমনটি সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বর্ণিত: প্রতি দুই রাকা‘আতে সালাম ফিরাতেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অপর বর্ণনায় বর্ণিত: “তারপর তিনি দুই রাকা‘আত পড়েন, তারপর দুই রাকা‘আত, তারপর দুই রাকা‘আত, তারপর দুই রাকা‘আত, তারপর দুই রাকা‘আত, তারপর দুই রাকা‘আত, তারপর এক রাকা‘আত বিতির আদায় করেন। অর্থাৎ দুই রাকাত থেকে পৃথক করে এক রাতাক আদায় করেন। কারণ, দুই রাকা‘আত, দুই রাকা‘আত করে ছয় বার পড়লে বিতিরের এক রাকা‘আত ছাড়া মোট বারো রাকা‘আত হবে। রাসূলের মোট সালাত ছিল তের রাকা‘আত। তাহলে বিতির কেবল এক রাকা‘আত বাকী ছিল। “তারপর তিনি কাত হয়ে নাক ডেকে ঘুমালেন”। অর্থাৎ. তিনি এমন আওয়াজে নিঃশ্বাস ছাড়তেন তার নাক ডাকার আওয়াজ শোনা যেত। আর তার অভ্যাস ছিল যখন ঘুমাতেন নাক ডাকতেন। “তারপর বিলাল সালাতের ঘোষণা দিলেন” অর্থাৎ তিনি তাকে ফজরের সালাত সম্পর্কে অবহিত করলেন। “ফলে তিনি প্রথমে ফজরের সুন্নাত পড়লেন। তারপর তিনি মসজিদে গমন করলেন এবং ফজরের সালাত জামা‘আতে আদায় করলেন। তবে ওযূ করলেন না। বরং পূর্বে ওযূ দ্বারা সালাত আদায় করলেন”। এটি তার বৈশিষ্ট্য। তার ঘুম ওযূ ভঙ্গকারী নয়। কারণ, তার চোখ ঘুমায় কিন্তু তার অন্তর জাগ্রত থাকে। যদি কোন নাপাকী বের হতো তবে তিনি অবশ্যই অনুভব করতেন। কিন্তু অন্যান্য মানুষ তার মতো নয়। এ কারণেই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন বললেন, “আপনি বিতির পড়ার আগে ঘুমান? তিনি বলেন, (হে আয়েশা আমার দুই চোখ ঘুমায় আমার অন্তর ঘুমায় না)। তিনি দো‘আয় বলতেন, অর্থাৎ এ রাতের দো‘আসমূহের মধ্যে এটি একটি দো‘আ “হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে নূর (বা আলো) দান করুন, আমার চোখে নূর দান করুন, আমার শ্রবণশক্তিতে নূর দান করুন, আমার ডানে নূর দান করুন, আমার বামে নূর দান করুন, আমার উপরে নূর দান করুন, আমার নিচে নূর দান করুন, আমার সামনে নূর দান করুন, আমার পেছনে নূর দান করুন, আমার জন্য নূর দান করুন”। তিনি তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ও দিক সমূহে নূর কামনা করেন। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হক ও তার রশ্নির বর্ণনা করা এবং তার প্রতি পথ দেখানো। ফলে তিনি তার সমগ্র অঙ্গ, দেহ, কার্যকলাপ, উঠবস, অবস্থা এবং ছয়টি দিকসহ সব বিষয়ে নূর কামনা করেন যাতে তার কোন কিছুই তার থেকে বিচ্যুত না হয়।

HadeethEnc.com-এ পড়ুন

৪ একবার

অর্থ ও সূত্র

আবূ উমামাহ্ বলেন, আমর ইবনু আবাসাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিনি বলতে শুনেছেন: “আল্লাহ তা’আলা শেষ রাতে তার বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হন। অতএব যারা এ সময় আল্লাহর যিকর করে (নামায পড়ে ও দু’আ করে), তুমি পারলে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও”।

এটি আবূ দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী বর্ণনা করেছেন। মান: সহীহ

ব্যাখ্যা

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেন: মহাপবিত্র রব রাতের শেষ তৃতীয়াংশে বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হন। হে মুমিন, এই সময়ে যারা সালাত আদায় করেন, ইবাদত আঞ্জাম দেন, তাওবা করেন এবং জিকির করেন, যদি আপনি তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত হতে তাওফিকপ্রাপ্ত এবং সক্ষম হন, তাহলে এটি এমন একটি বিষয় যা আপনার অর্জন করা এবং তাতে চেষ্টা করা জরুরি।

উপকারিতা

  • এখানে মুসলিমদেরকে রাতের শেষভাগে যিকির করতে উদ্বুদ্ধ করা।
  • জিকির, দোয়া ও সালাতের জন্য সময়গুলোর ভেতর তারতম্য রয়েছে।
  • মিরাক বলেছেন: তাঁর বাণী: " أقرب ما يكون الرب من العبد " (রব বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হন) এবং তাঁর বাণী: "أقرب ما يكون العبد من ربه وهو ساجد" (সেজদারত অবস্থায় বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়) এর মাঝে পার্থক্য হলো: এখানে সেই সময়টি বোঝানো হয়েছে যখন রব তার বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হন, সেটি হলো মধ্যরাত। আর সেখানে বান্দার সেই অবস্থাটি বোঝানো হয়েছে যখন সে তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়, সেটি হল সেজদারত অবস্থা।

HadeethEnc.com-এ পড়ুন

৫ একবার

অর্থ ও সূত্র

জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “রাত্রিকালে এমন একটি সময় রয়েছে যে সময় কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণের প্রার্থনা করলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করেন। আর সে সময়টি রয়েছে প্রতি রাতে।”

এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মান: সহীহ

ব্যাখ্যা

প্রতি রাতে একটি সময় রয়েছে যখন দো‘আ করলে তা কবুল করা হয়। অতএব, কোনো মুসলিম যদি সে সময়ে হারাম ব্যতীত কোনো দো‘আ করে আল্লাহ অবশ্যই তার দো‘আ কবুল করবেন। আর সেটি হচ্ছে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ- যা অন্যান্য সহীহ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত।

HadeethEnc.com-এ পড়ুন

প্রশ্ন

এই পাতায় কী আছে?

তাহাজ্জুদের দোয়া: প্রতিটি আরবিতে, এর অর্থ, উৎস হাদিস, মান ও ব্যাখ্যাসহ।

অনুবাদগুলো কোথা থেকে নেওয়া?

HadeethEnc.com থেকে, যা অনূদিত নববি হাদিস বিশ্বকোষ। প্রতিটি হাদিস তারা যেভাবে প্রকাশ করেছে ঠিক সেভাবেই, সূত্র ও মানসহ এবং মূলের লিংকসহ দেখানো হয়।

প্রতিদিন কি রিমাইন্ডার পেতে পারি?

হ্যাঁ। Android-এর জন্য বিনামূল্যের Qabas অ্যাপ প্রতিদিন আপনাকে সকাল ও সন্ধ্যার জিকির মনে করিয়ে দেয় এবং এতে একই কাউন্টার আছে।