إِنَّ عِدَّةَ ٱلشُّهُورِ عِندَ ٱللَّهِ ٱثۡنَا عَشَرَ شَهۡرٗا فِي كِتَٰبِ ٱللَّهِ يَوۡمَ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ مِنۡهَآ أَرۡبَعَةٌ حُرُمٞۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُۚ فَلَا تَظۡلِمُواْ فِيهِنَّ أَنفُسَكُمۡۚ وَقَٰتِلُواْ ٱلۡمُشۡرِكِينَ كَآفَّةٗ كَمَا يُقَٰتِلُونَكُمۡ كَآفَّةٗۚ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٣٦
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টির দিন থেকেই ১ আল্লাহ্র বিধানে ২ আল্লাহ্র কাছে গণনায় মাস বারটি ৩, তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস ৪, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন ৫। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
টীকা
১ এর দ্বারা এদিকে ঈঙ্গিত করা হয় যে, মাসগুলোর ধারাবহিকতা নির্ধারিত হয় আসমান ও যমীনের সৃষ্টি পরবর্তী মুহুর্তে। [সা'দী]।
২ এখানে (فِیۡ کِتٰبِ اللّٰہِ) বলে স্পষ্ট করা হয় যে, বিষয়টি সৃষ্টির প্রথম দিনেই তাকদীরে সুনির্দিষ্ট করা আছে। [সা’দী] আর সে অনুসারে লওহে মাহফুযে লিখিত রয়েছে। [কুরতুবী]
৩ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গণনায় মাস হল বারটি। এখানে উল্লেখিত عدة অর্থ গণনা। شهور হল شهر এর বহুবচন। আয়াতের সারমর্ম হল, আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যাটি বারটি নির্ধারিত। এতে কম বেশি করার কারো সুযোগ নেই। জাহেলিয়াতের লোকেরা বদলালেও তোমরা সেটা বদলাতে পার না। তোমাদের কাজ হবে আল্লাহর এ নির্দেশ মোতাবেক সেটাকে ঠিক করে নেয়া। কুরতুবী]
৪ বিদায় হজ্জের সময় মিনা প্রান্তরে প্রদত্ত খোতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করে বলেন, তিনটি মাস হল ধারাবাহিক যিলকদ, যিলহজ ও মহররম, অপরটি হল রজব। [বুখারী ৩১৯৭ মুসলিম ১৬৭৯] আবু বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় সময় আবার ঘুরে তার নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ফিরে এসেছে। যে পদ্ধতিতে আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন সেদিনের মত। মাসের সংখ্যা বারটি। তন্মধ্যে চারটি হচ্ছে, হারাম মাস। তিনটি পরপর যিলকদ, যিলহজ ও মুহাররাম। আর হচ্ছে মুদার গোত্রের রজব মাস, যা জুমাদাস সানী ও শাবান মাসের মাঝখানে থাকে।’ [বুখারী ৪৬৬২; মুসলিম ১৬৭৯]
৫ অর্থাৎ মাসগুলোর ধারাবাহিকতা নির্ধারণ ও সম্মানিত মাসুগলোর সাথে সম্পৃক্ত হুকুম-আহকামকে সৃষ্টির প্রথম পর্বের ইলাহী নিয়মের সাথে সঙ্গতিশীল রাখাই হল সঠিক দীন। এতে কোনো মানুষের কম-বেশী কিংবা পরিবর্তন - পরিবর্ধন করার প্রয়াস অসুস্থ বিবেক ও মন্দ স্বভাবের আলামত। এর দ্বারা আরও প্রমাণিত হয় যে, ধারাবাহিকতা এবং মাসগুলোর যে নাম ইসলামী শরীআতে প্রচলিত, তা মানবরচিত পরিভাষা নয়, বরং রাববুল আলামীন যেদিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেদিনই মাসের তারতীব, নাম ও বিশেষ মাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুম আহকাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আয়াত দ্বারা আরও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে শরীআতের আহকামের ক্ষেত্রে চন্দ্রমাসই নির্ভরযোগ্য। চন্দ্রমাসের হিসেব মতেই সাওম, হজ ও যাকাত প্রভৃতি আদায় করতে হয়। [কুরতুবী] তবে কুরআন মজীদ চন্দ্রের মত সূর্যকেও সন-তারিখ ঠিক করার মানদন্ডরূপে অভিহিত করেছেন। [সূরা আল-আনআম ৯৬; সূরা আর-রাহমান ৫; সূরা ইউনুস ৫] অতএব চন্দ্র ও সূর্য উভয়টির মাধ্যমেই সনতারিখ নির্দিষ্ট করা জায়েজ। তবে চন্দ্রের হিসাব আল্লাহর অধিকতর পছন্দ। তাই শরীআতের আহকামকে চন্দ্রের সাথে সংশ্লিষ্ট রেখেছেন। এজন্যে চন্দ্র বছরের হিসাব সংরক্ষণ করা ফরযে-কেফায়া, সকল উম্মত এ হিসাব ভুলে গেলে সবাই গোনাহগার হবে। চাদের হিসাব ঠিক রেখে অন্যান্য সূত্রের হিসাব ব্যবহার করা জায়েয আছে।
তাফসীর
৩৬. আল্লাহর বিধান ও ফায়সালায় এক বছরের মাসের সংখ্যা সর্বমোট বারোটি। যা আল্লাহ তা‘আলা আকাশ ও জমিন সৃষ্টির শুরুতে লাওহে মাহফ‚যে লিপিবদ্ধ করেছেন। উক্ত বারো মাসের চার মাসে আবার আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম করেছেন। যা লাগাতার তিন মাস তথা যুল-কি’দাহ, যুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। আরেকটি একক মাস তথা রজব। উক্ত বাৎসরিক মাসের সংখ্যা ও সেগুলোর চারটিকে হারাম করে দেয়া মূলতঃ একটি সঠিক ধর্ম। তাই তোমরা এ হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ করে এবং এগুলোর সম্মান নষ্ট করে নিজেদের উপর যুলুম করো না। আর তোমরা সকল প্রকারের মুশরিকের সাথে যুদ্ধ করো যেমনিভাবে তারা সবাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। তোমরা জেনে রাখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাহায্য ও অনুগ্রহ নিয়ে তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্যকারী মুত্তাকীদের সাথেই রয়েছেন। আর আল্লাহ তা‘আলা যার সাথে রয়েছেন তাকে কেউ কখনো পরাজিত করতে পারবে না।